Banner728

‘শেষের পথে’ ইরান যুদ্ধ বললেন ট্রাম্প

 


ইরান যুদ্ধ ‘শেষের পথে’: ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভূ-রাজনীতি

সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা বিশ্ববাসীকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। ঠিক এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের দাবি—ইরান যুদ্ধ এখন ‘শেষের পথে’

তার এই মন্তব্য একদিকে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে এটি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। ট্রাম্পের এই অবস্থানের নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে এবং এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


ট্রাম্পের ‘শান্তি’র ফর্মুলা ও ইরানের সাথে সংঘাত

ডোনাল্ড ট্রাম্প সব সময়ই নিজেকে একজন ‘ডিল মেকার’ বা চুক্তি সম্পাদনকারী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। তার প্রথম মেয়াদে তিনি ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বারাক ওবামার আমলে করা পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে বেরিয়ে এসে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।

তবে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পথে এবং জয়ী হওয়ার পর ট্রাম্পের সুর কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি বারবার বলছেন যে, তিনি যুদ্ধ চান না, বরং যুদ্ধের সমাপ্তি চান। তার মতে, ইরানের সাথে একটি নতুন এবং কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব, যা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি আনবে। ট্রাম্পের "যুদ্ধ শেষের পথে" মন্তব্যের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:

  1. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: ট্রাম্প মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের বাজার অস্থির হবে এবং মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

  2. আমেরিকা ফার্স্ট নীতি: তিনি চান না আমেরিকার অর্থ ও সৈন্য বিদেশের মাটিতে দীর্ঘকাল আটকে থাকুক।

  3. ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস: ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো আরব দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে ইরানকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা, যাতে তারা যুদ্ধের পথ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।


ইরান কি সত্যিই যুদ্ধের পথ ত্যাগ করবে?

ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে দেশটি একটি বড় মাপের যুদ্ধের ধকল সইতে পারবে কি না, তা নিয়ে খোদ ইরানের ভেতরেই সংশয় রয়েছে। ট্রাম্পের বিজয়ের পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং নতুন সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

ইরান বুঝতে পারছে যে, ট্রাম্পের সাথে সমঝোতায় না এলে তাদের অর্থনীতি আরও ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তবে ইরান কোনোভাবেই তাদের ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ (যেমন: হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথি) পুরোপুরি ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্পের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি চুক্তি করা, যেখানে ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে রাজি হবে।


ইসরায়েলের অবস্থান ও ট্রাম্পের প্রভাব

ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তবে নেতানিয়াহু যেখানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি হামলার পক্ষপাতী, ট্রাম্প সেখানে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলছেন। ট্রাম্পের বার্তা পরিষ্কার: "আমি আপনাকে (নেতানিয়াহু) সমর্থন করি, কিন্তু আমি দ্রুত এই সংঘাতের সমাপ্তি দেখতে চাই।"

ট্রাম্পের এই অবস্থান ইসরায়েলকে কিছুটা চাপে ফেলবে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসন যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ইসরায়েলের পক্ষে একা ইরানের মতো শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী লড়াই চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।


ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব

ট্রাম্পের এই মন্তব্য যদি বাস্তবে রূপ নেয় এবং ইরান যুদ্ধ সত্যিই থেমে যায়, তবে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে:

  • তেলের দাম হ্রাস: মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরলে অপরিশোধিত তেলের বাজার স্থিতিশীল হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ।

  • রাশিয়া-চীন ফ্যাক্টর: ইরান রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহযোগী। ইরান যদি পশ্চিমের সাথে কোনো সমঝোতায় আসে, তবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার রসদ সরবরাহে টান পড়তে পারে। আবার চীনের মধ্যস্থতায় ইরান-সৌদি সম্পর্ক যে মোড় নিয়েছে, তাতে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ চীনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাবে।

  • আঞ্চলিক জোটের বিন্যাস: ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় সৌদি আরবসহ অন্যান্য সুন্নি মুসলিম দেশগুলো বড় ভূমিকা পালন করবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারে।


চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

ট্রাম্পের "যুদ্ধ শেষের পথে" দাবিটি যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবে এটি বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। এর প্রধান বাধাগুলো হলো:

  1. আস্থার সংকট: আমেরিকার সাথে ইরানের আস্থার সংকট চরমে। বিশেষ করে জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার নির্দেশ ট্রাম্প দিয়েছিলেন, যা ইরান আজও ভোলেনি।

  2. উগ্রপন্থীদের চাপ: ইসরায়েল এবং ইরান—উভয় দেশের ভেতরেই এমন শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে যারা কোনো ধরনের সমঝোতা চায় না।

  3. পারমাণবিক কর্মসূচি: ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কতটুকু সীমিত করবে, তা নিয়ে একমত হওয়া প্রায় অসম্ভব একটি কাজ।


উপসংহার

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ইরান যুদ্ধ শেষের পথে’ মন্তব্যটি মূলত একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি। তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আমেরিকার নেতৃত্বে আবারও বিশ্ব শান্তিতে ফিরবে। তবে এই শান্তি কেবল ট্রাম্পের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে না; এটি নির্ভর করছে তেহরানের নমনীয়তা এবং ইসরায়েলের ধৈর্য ধারণের ওপর।

যদি ট্রাম্প সত্যিই ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারেন এবং একটি টেকসই চুক্তি নিশ্চিত করতে পারেন, তবে এটি হবে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় কূটনৈতিক বিজয়। অন্যথায়, এই মন্তব্য কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই রয়ে যাবে। বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য যে, ট্রাম্পের এই "শান্তির মিশন" মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত ইতিহাসে নতুন কোনো অধ্যায় যোগ করতে পারে কি না।

Post a Comment

0 Comments