রাজশাহী ও নওগাঁর কোন জাতের আম কবে আসছে বাজারে
রাজশাহী ও নওগাঁর আমের বাজারজাতকরণ সময়সূচী ২০২৬
বাংলাদেশে ফলের রাজা আম, আর আমের রাজধানী বলা হয় রাজশাহীকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নওগাঁ জেলা আম উৎপাদনে এবং গুণমানে রাজশাহীকে সমানে সমান টেক্কা দিচ্ছে। মূলত মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাজারে আমের সমারোহ শুরু হয়।
১. গোপালভোগ: আমের জগতের 'ফার্স্ট বয়'
রাজশাহী ও নওগাঁর বাগানে সবচেয়ে আগে পাকে গোপালভোগ। এটি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং আঁশহীন।
বাজার আসার সময়: ১৫ মে থেকে ২০ মে।
বৈশিষ্ট্য: খোসা কিছুটা মোটা হলেও আঁটি পাতলা। মিষ্টতার দিক থেকে এটি শীর্ষস্থানীয়।
২. গুটি ও স্থানীয় জাত
সবচেয়ে আগে বাজারে আসে বিভিন্ন প্রকার গুটি আম। এগুলোর নির্দিষ্ট কোনো জাত না থাকলেও স্বাদে বেশ ভালো হয় এবং দামেও সস্তা।
বাজার আসার সময়: ১০ মে থেকে ১৫ মে।
ব্যবহার: সাধারণত আচার বা কাঁচা খাওয়ার জন্য এগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়।
৩. ক্ষীরশাপাত বা হিমসাগর: সেরা জনপ্রিয় আম
ভোজনরসিকদের কাছে হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতের আবেদন সবচেয়ে বেশি। রাজশাহীর হিমসাগর জিআই (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।
বাজার আসার সময়: ২৫ মে থেকে ২৮ মে।
বৈশিষ্ট্য: অত্যন্ত মিষ্টি, সুঘ্রাণযুক্ত এবং শাঁসালো। এটি বাজারে আসা মাত্রই দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
৪. ল্যাংড়া: স্বাদে অতুলনীয়
ল্যাংড়া আমের খ্যাতি তার পাতলা আঁটি এবং চমৎকার ফ্লেভারের জন্য। এটি পাকলে গায়ের রং হালকা সবুজ থাকলেও ভেতরে টকটকে হলুদাভ হয়।
বাজার আসার সময়: জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ (সাধারণত ৬ জুন থেকে ১০ জুন)।
বৈশিষ্ট্য: ল্যাংড়া আমে ক্যালরি এবং ভিটামিন-সি এর পরিমাণ বেশি থাকে।
৫. আম্রপালি: নওগাঁর গর্ব
নওগাঁ জেলার সাপাহার ও পোরশা উপজেলার আম্রপালি সারা দেশে জনপ্রিয়। আম্রপালি আকারে ছোট কিন্তু স্বাদে প্রচণ্ড মিষ্টি।
বাজার আসার সময়: ১৫ জুন থেকে ২০ জুন।
বৈশিষ্ট্য: দেরি করে পাকলেও এই আমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। নওগাঁর আম্রপালি সাধারণত আকারে বড় এবং রং আকর্ষণীয় হয়।
৬. ফজলি ও সুরমা ফজলি
আকারে বড় এবং ওজনে ভারী আমের নাম নিলেই আসে ফজলির কথা। বাঘা ও চারঘাটের ফজলি আম পৃথিবীখ্যাত।
বাজার আসার সময়: ১৫ জুন থেকে ২৫ জুনের পর।
বৈশিষ্ট্য: একটি আম ওজনে ১ কেজির বেশি হতে পারে। এটি মূলত সিজনের শেষের দিকের আম।
৭. আশ্বিনা ও বারি-৪
সিজন যখন শেষের পথে, তখন বাজারে রাজত্ব করে আশ্বিনা এবং বারি-৪ জাতের আম।
বাজার আসার সময়: জুলাইয়ের শুরু থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
বৈশিষ্ট্য: দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত থাকে এবং দেরিতে পাকে বলে এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেক।
রাজশাহী বনাম নওগাঁ: আমের পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | রাজশাহী | নওগাঁ |
| প্রধান জাত | ক্ষীরশাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি | আম্রপালি, বারি-৪, আশ্বিনা |
| মাটির গুণ | গঙ্গা অববাহিকার পলি মাটি | বরেন্দ্র অঞ্চলের এঁটেল মাটি |
| স্বাদ | ঐতিহ্যবাহী ও মিষ্টতার ভারসাম্য | তীব্র মিষ্টতা ও ঘ্রাণ |
| উৎপাদন | বাগানগুলো অনেক পুরোনো | আধুনিক পদ্ধতিতে নতুন বাগান |
নিরাপদ আম চেনার উপায়
বাজারে কার্বাইড বা ফরমালিনমুক্ত আম চেনার কিছু সহজ উপায় রয়েছে:
রঙের ভিন্নতা: প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমে সব অংশ সমানভাবে হলুদ হয় না। কিছু অংশ সবুজ ও কিছু অংশ হলুদ থাকতে পারে।
মাছি বসা: কেমিক্যালমুক্ত মিষ্টি আমে মাছি বসবে, কিন্তু বিষাক্ত আমে মাছি বসতে চায় না।
ঘ্রাণ: আমের বোঁটার কাছে নাকে নিলে সুন্দর ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। কেমিক্যাল মেশানো আমে কোনো ঘ্রাণ থাকে না বা ওষুধের গন্ধ পাওয়া যায়।
উপসংহার
রাজশাহী ও নওগাঁর আম কেবল ফল নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই আমের উৎসবে মাতবে পুরো দেশ। আম কেনার সময় অবশ্যই জেলা প্রশাসন নির্ধারিত তারিখগুলো মাথায় রাখা উচিত যাতে অপরিপক্ক আমের কারণে স্বাদ ও স্বাস্থ্যের হানি না ঘটে।
No comments