ADS728

Breaking News

বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল: ফরাসিদের স্তব্ধ করে ফাইনালে ইয়ামাল-ওয়ারজাবালের স্পেন, ব্যর্থ এমবাপ্পে।

 


বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল: ফরাসিদের স্তব্ধ করে ফাইনালে ইয়ামাল-ওয়ারজাবালের স্পেন, ব্যর্থ এমবাপ্পে

বিশ্ব ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যকার দ্বৈরথ মানেই টানটান উত্তেজনা, মাঠের চুলচেরা বিশ্লেষণ আর কোটি কোটি ভক্তের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া। বিশ্বমঞ্চের প্রথম সেমিফাইনালে ফরাসিদের স্তব্ধ করে ২-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নিয়েছে ‘লা রোজা’ (La Roja) খ্যাত স্পেন। এই জয়ের মাধ্যমে স্প্যানিশ ফুটবলের কৌশলী ও নান্দনিক ধারার আধিপত্য আরও একবার প্রমাণিত হলো। অন্যদিকে, কিলিয়ান এমবাপ্পেদের ফ্রান্সকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে একরাশ হতাশা আর শূন্য হাতে।

গতি, পাসিং এবং নিখুঁত ট্যাকটিকসের এক অসাধারণ প্রদর্শনীতে ফরাসি ডিফেন্সকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ম্যাচটি নিজেদের করে নেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই মহাকাব্যিক সেমিফাইনাল ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তের বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

দুই কোচের মগজযুদ্ধ: দেশঁকে পিছনে ফেললেন লা ফুয়েন্তে

পারফরম্যান্সের নিরিখে বিশ্বকাপের সেরা দু’দল মুখোমুখি হয়েছিল প্রথম সেমিফাইনালে। মাঠে ফুটবলারদের লড়াইয়ের পাশাপাশি ফুটবলপ্রেমীদের ব্যাপক আগ্রহ ছিল দুই কোচের কৌশলের টক্কর নিয়েও। তাতে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশঁকে পুরোপুরি পিছনে ফেলে দিলেন স্পেনের মাস্টারমাইন্ড লুইস দে লা ফুয়েন্তে।

আগ্রাসী মেজাজে ম্যাচ শুরু করেছিল স্পেন। পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আয়মেরিক লাপোর্তেরা মাঝ মাঠেই নিখুঁত অফসাইডের ফাঁদ পেতে রেখেছিলেন। টুর্নামেন্টে ফর্মে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং উসমান দেম্বেলে জুটিকে এক রকম অকেজো করে দেন স্পেনের এই ডিফেন্ডাররা। প্রথমার্ধে একাধিক বার মাঝ মাঠ পেরিয়েই অফসাইডে আটকে যান এমবাপ্পেরা! বিশেষ করে তরুণ ডিফেন্ডার কুবারসি প্রায় সারাক্ষণ নজরবন্দি করে রাখেন ফরাসি অধিনায়ককে। ম্যাচের ১০ মিনিটেই বক্সের কাছে ফ্রি-কিক পায় স্পেন। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলেও গোলের জন্য লা রোজাদের খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি।

লুকাস ডিগনের সেই ভুল এবং স্পেনের পেনাল্টি

ম্যাচের ২০ মিনিটের মাথায় ঘটে সেই নাটকীয় ঘটনা, যা পুরো ম্যাচের চিত্রনাট্য বদলে দেয়। বক্সে উড়ে আসা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত স্পেনের বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামালের গায়ে সরাসরি পা চালিয়ে দেন ফ্রান্সের ডিফেন্ডার লুকাস ডিগনে। ইয়ামালকে ফাউল করার অপরাধে রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেন। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ম্যাচের শুরুতেই এই মারাত্মক ভুলের খেসারত দিতে হল দিদিয়ের দেশঁর দলকে।

ঐতিহাসিক পেনাল্টি শট: পেনাল্টি থেকে গোল করতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি স্পেনের নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার মিকেল ওয়ারজ়াবাল। ঠাণ্ডা মাথার নিখুঁত শটে তিনি পরাস্ত করেন ফরাসি গোলরক্ষককে।

এই গোলের সাথে সাথেই ওয়ারজ়াবাল এক অনন্য কীর্তি গড়েন। চলতি মরসুমে দেশের হয়ে ১৪টি গোল হয়ে গেল তাঁর। স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে আর কোনও ফুটবলার একক মরসুমে দেশের জার্সিতে এত গোল করতে পারেননি।

প্রথমার্ধে ফ্রান্সের প্রতিরোধ ও উনাই সিমোনের দেয়াল

১-০ গোলে পিছিয়ে পড়লেও মাঠের লড়াই থেকে গুটিয়ে যায়নি ফ্রান্স। ধীরে ধীরে মাঝ মাঠে দাপট বাড়াতে থাকে তারা। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে জমে ওঠে সেমিফাইনালের মহারণ। তবে দলগত কৌশল এবং স্পেনের ডিফেন্সের ব্যক্তিগত দক্ষতার লড়াইয়ে বার বার আটকে গিয়েছে ফ্রান্স। এমবাপ্পেরা খুব বেশি পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেননি প্রথমার্ধে।

বার দুয়েক স্প্যানিশ রক্ষণকে পরাস্ত করে গোলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন এমবাপ্পেরা। কিন্তু পোস্টের নিচে চীনের প্রাচীর হয়ে সতর্ক ছিলেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। দু’বারই তিনি অনেকটা সামনে এগিয়ে এসে ফরাসি ফরোয়ার্ডদের শট মারার জায়গা ছোট করে দেন এবং নিশ্চিত পতন থেকে দলকে রক্ষা করেন।

উল্টো ইয়ামাল, ওয়ারজ়াবাল, আলেক্স বায়েনারা ফ্রান্সের বক্সে বেশ কয়েক বার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেন। এরই মধ্যে ম্যাচের ৩০ মিনিটে বড় ধাক্কা খায় ফরাসি শিবির। দলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার উইলিয়াম স্যালিবা চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। পরিবর্ত হিসাবে দেশঁ মাঠে নামান ম্যাক্সিন্স লাক্রোইক্সকে।

দ্বিতীয়ার্ধে পোরোর আঘাত: ফ্রান্সের কফিনে শেষ পেরেক

চলতি বিশ্বকাপের আগের ম্যাচগুলিতে ফ্রান্সকে যতটা অপ্রতিরোধ্য দেখিয়েছিল, স্পেনের বিরুদ্ধে এই ম্যাচে তাদের তেমন দেখাল না। ফরাসি আক্রমণভাগকে কিছুটা অগোছাল মনে হয়েছে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাঠের সর্বত্র চাপ বজায় রেখে গিয়েছে স্পেন।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন এমবাপ্পেরা। স্পেনের রক্ষণে চাপ বাড়াতে শুরু করে ফ্রান্স। তবে বক্সের মধ্যে গিয়ে বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিল ফরাসিরা। স্পেন এ সময় খেলছিল মূলত প্রতি-আক্রমণাত্মক (Counter-attack) ফুটবল। ৫৮ মিনিটে তেমনই একটি গতিময় আক্রমণ থেকে মারাত্মক ভুল করে বসে ফরাসি রক্ষণভাগ। বক্সের একদম ফাঁকায় বল পেয়ে যান স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পেদ্রো পোরো। ডান পায়ের জোরালো শটে মাইক মাইগনানকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান তিনি। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে ফ্রান্স।

মেসির মতো উদ্ধার করতে পারলেন না এমবাপ্পে

২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর গোলের খোঁজে ৫৯ মিনিটে উদ্বিগ্ন কোচ দেশঁ ব্র্যাডলি বার্কোলাকে তুলে নিয়ে মাঠে নামান ডেজ়িরে ডুয়েকে। আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধিই ছিল ফরাসি কোচের লক্ষ্য। কিন্তু অত্যন্ত সতর্ক ছিল স্পেনের রক্ষণ এবং মাঝমাঠ। বিশেষ করে স্প্যানিশদের 'অফ দ্য বল' (Off the ball) মুভমেন্ট ছিল চোখে পড়ার মতো।

৬৪ মিনিটে একটি প্রতি আক্রমণ থেকে দুর্দান্ত গোল করেছিলেন লামিনে ইয়ামাল। কিন্তু সামান্য অফসাইডের জন্য রেফারি তাঁর গোলটি বাতিল করেন। ৭২ মিনিটে মাইকেল ওলিসে এবং ডিগনেকে তুলে নিয়ে রায়ান চেরকি এবং থিয়ো হের্নান্দেজ়কে নামান ফ্রান্স কোচ। তাতেও কোনো লাভ হয়নি।

ম্যাচের ৮৭ মিনিটে বক্সের ঠিক মাথায় বেশ ভাল জায়গায় ফ্রি-কিক পায় ফ্রান্স। সমতা ফেরানো বা ব্যবধান কমানোর এটিই ছিল সেরা সুযোগ। কিন্তু কিলিয়ান এমবাপ্পের নেওয়া শটটি অল্পের জন্য গোলবারের বাইরে চলে যায়। মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে দলকে লিওনেল মেসির মতো একা কাঁধে টেনে উদ্ধার করতে পারলেন না এমবাপ্পে। এক দম শেষে সংযুক্ত সময়ে (Injury Time) উসমান দেম্বেলের একটি জোরালো শটও চমৎকার দক্ষতায় আটকে দেন উনাই সিমন।

ম্যাচের পরিসংখ্যান এক নজরে

পরিসংখ্যানফ্রান্সস্পেন
গোল
বল পজেশন৪৫%৫৫%
শট (লক্ষ্যে)৮ (২)১১ (৫)
পাসিং অ্যাকুরেসি৮৬%৯০%
অফসাইড

ফুটবল বিশ্বের নতুন যুগের সূচনা

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায় স্পেনের ঐতিহাসিক জয়। ২-০ গোলের এই জয়ের মাধ্যমে স্পেনের কাছে টানা তিন ম্যাচ হারল ফ্রান্স। অন্যদিকে, লামিনে ইয়ামালের হাত ধরে দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল লা রোজা ব্রিগেড। স্পেনের এই তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশ্রণটি যে দারুণ কাজ করছে, তা এই ম্যাচের ট্যাকটিক্যাল পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট। এই ঐতিহাসিক জয় স্প্যানিশ ফুটবলের সোনালী যাত্রাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল বিশ্বজয়ের মঞ্চে।

No comments