ADS728

Breaking News

বিশ্ববাজারে ভারতের নতুন টেক-ধমক: মোবাইল সেট উৎপাদনে ভারতের নতুন চমক ও বৈশ্বিক বাজারের রূপান্তর

 


কয়েক বছর আগেও যে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল আমদানিকারক দেশ ছিল, আজ সেই ভারতই বিশ্বের স্মার্টফোন উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু বা গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হয়ে উঠেছে। চীনকে টেক্কা দিয়ে মোবাইল সেট উৎপাদনে একের পর এক নতুন চমক দেখাচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। প্রযুক্তি এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ভারতের এই অভাবনীয় উত্থান এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার মূল বিষয়।

২০২৬ সালে এসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইল উৎপাদন খাতকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে ৬২,৫০০ কোটি রুপির মেগা বাজেট ঘোষণা করেছে, যা প্রযুক্তি বিশ্বে এক বিশাল আলোড়ন তৈরি করেছে। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সংযোজন (Assembly) থেকে বের হয়ে এবার নিজস্ব ব্র্যান্ড এবং নিজস্ব ডিজাইনের স্মার্টফোন তৈরির দিকে ঝুঁকছে দেশটি। আজকের প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব মোবাইল উৎপাদনে ভারতের এই নতুন চমক, মেগা প্রজেক্ট এবং বৈশ্বিক বাজারে এর প্রভাব নিয়ে।

১. ৬২,৫০০ কোটি রুপির মেগা স্কিম: MPMS কী?

মোবাইল উৎপাদনে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে ভারত সরকার চালু করেছে 'মোবাইল ফোন ম্যানুফ্যাকচারিং স্কিম' (MPMS) পূর্ববর্তী সফল প্রজেক্ট PLI (Production Linked Incentive)-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত এই নতুন মেগা প্রজেক্টটি বাস্তবায়িত হবে।

এই নতুন স্কিমের মূল চমকগুলো হলো:

  • আর্থিক প্রণোদনা: ভারতে উৎপাদিত মোবাইল বিক্রির ওপর কোম্পানিগুলোকে ২.২৫% থেকে ৫% পর্যন্ত ক্যাশব্যাক বা প্রণোদনা দেওয়া হবে।

  • দেশীয় যন্ত্রাংশ ব্যবহারে বোনাস: যদি কোনো কোম্পানি বিদেশ থেকে পার্টস না এনে ভারতের স্থানীয় বাজার থেকে মোবাইলের ডিসপ্লে, ব্যাটারি বা ক্যামেরা মডিউল কেনে, তবে তারা আরও ১.৫% অতিরিক্ত প্রণোদনা পাবে।

  • ডিজাইন ও আরঅ্যান্ডডি (R&D): কোনো কোম্পানি যদি ভারতে বসে মোবাইলের নিজস্ব ডিজাইন এবং গবেষণা করে, তবে তাদের জন্য অতিরিক্ত ৩% বিশেষ ইনসেনটিভের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

২. আমদানিকারক থেকে শীর্ষ রপ্তানিকারক: অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, গত এক দশকে ভারত এই খাতে কতটা অবিশ্বাস্য উন্নতি করেছে। ভারতের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (MeitY) কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী:

  • এক নম্বরে স্মার্টফোন: ২০১৪-১৫ সালে ভারতের শীর্ষ ১০০টি রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্মার্টফোনের কোনো নামই ছিল না। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে স্মার্টফোনই হয়ে উঠেছে ভারতের একক বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য

  • ১৬৫ গুণ বৃদ্ধি: ২০১৪ সালে ভারত মাত্র ১,৫৬৬ কোটি রুপির মোবাইল রপ্তানি করেছিল। আর ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৬০ লাখ কোটি রুপিতে

  • ৯৯.২% স্বনির্ভরতা: বর্তমানে ভারতে ব্যবহৃত মোট মোবাইল ফোনের ৯৯.২ শতাংশই সম্পূর্ণ 'মেড ইন ইন্ডিয়া' অর্থাৎ দেশের ভেতরেই উৎপাদিত।

  • কর্মসংস্থান: এই খাতটিতে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি কাজ করছেন, যার মধ্যে প্রায় ৭০% কর্মীই নারী।

৩. অ্যাপল-স্যামসাংয়ের 'প্রথম পছন্দ' এখন ভারত

ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বড় বড় টেক জায়ান্টগুলো তাদের ফ্যাক্টরি চীন থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সুযোগটি শতভাগ কাজে লাগিয়েছে ভারত।

মার্কিন টেক জায়ান্ট অ্যাপল (Apple) এখন তাদের লেটেস্ট আইফোন মডেলগুলো (যেমন আইফোন ১৬ বা আসন্ন সংস্করণসমূহ) চীনের পাশাপাশি ভারতের চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুর টাটা ও ফক্সকন ফ্যাক্টরিতে তৈরি করছে। শুধু অ্যাপলই নয়, স্যামসাং (Samsung) বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মোবাইল উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছে ভারতের নয়ডায়।

বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদিত স্মার্টফোনের ভলিউম বা সংখ্যার দিক থেকে ভারত এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল প্রস্তুতকারক দেশ

৪. সংযোজন (Assembly) থেকে নিজস্ব ব্র্যান্ড ও ডিজাইনের দিকে যাত্রা

এতদিন ধরে ভারত মূলত বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর পার্টস এনে দেশে জোড়া দিত বা 'অ্যাসেম্বল' করত। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন চমক হলো—ভারত এখন নিজস্ব মোবাইল ব্র্যান্ড এবং নিজস্ব ডিজাইন তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে।

বর্তমানে ভারতের মোবাইলের অভ্যন্তরীণ ভ্যালু অ্যাডিশন (Domestic Value Addition) ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে। নতুন MPMS স্কিমের মাধ্যমে আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে এই ভ্যালু অ্যাডিশন ৪০-৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মানে হলো, খুব শীঘ্রই প্রসেসর ও মাদারবোর্ডের মতো জটিল ও দামি যন্ত্রাংশগুলোও ভারতে তৈরি হতে শুরু করবে।

৫. ভারতের এই সাফল্যের মূল কারণ কী?

মোবাইল উৎপাদনে ভারতের এই অভাবনীয় চমকের পেছনে মূলত ৩টি মূল চালিকাশক্তি কাজ করেছে:

প্রধান চালিকাশক্তিএর প্রভাব
১. সরকারের দূরদর্শী নীতি'মেক ইন ইন্ডিয়া' ক্যাম্পেইন এবং সময়োপযোগী পিএলআই ও এমপিএমএস স্কিমের মাধ্যমে বড় কোম্পানিগুলোকে ট্যাক্স ছাড় ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া।
২. লিথিয়াম ব্যাটারি ও চিপসেটে শুল্ক ছাড়সরকার ২০২৯ সাল পর্যন্ত মোবাইলের ডিসপ্লে মডিউল ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর কাস্টমস ডিউটি বা আমদানি শুল্ক মওকুফ করেছে, ফলে উৎপাদন খরচ কমেছে।
৩. বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও সস্তা শ্রমভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার নিজস্ব বিশাল বাজার রয়েছে, পাশাপাশি দক্ষ ও সস্তা শ্রমিকের সহজলভ্যতা বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করেছে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: মোবাইল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ কোনটি?

উত্তর: বর্তমানে মোবাইল ফোন উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ হলো চীন। তবে ভারত খুব দ্রুত গতিতে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে এবং চীনের একচেটিয়া বাজারে বড় ধরণের ভাগ বসাচ্ছে।

প্রশ্ন ২: ভারতে তৈরি ফোন কি বাংলাদেশে পাওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে স্যামসাং, শাওমি, রিয়েলমি বা আইফোনের যেসব হ্যান্ডসেট পাওয়া যায়, তার একটি বড় অংশ ভারত থেকে আমদানিকৃত অথবা ভারতের ফ্যাক্টরিতে তৈরি যন্ত্রাংশ দ্বারা আমাদের দেশে সংযোজিত।

প্রশ্ন ৩: ভারতের এই নতুন প্রজেক্টের লক্ষ্য কী?

উত্তর: ২০২৬ সালে অনুমোদিত নতুন মোবাইল ফোন ম্যানুফ্যাকচারিং স্কিমের (MPMS) মূল লক্ষ্য হলো আগামী ৫ বছরে ৩৯ লাখ কোটি রুপির মোবাইল উৎপাদন করা এবং ভারতের নিজস্ব গ্লোবাল মোবাইল ব্র্যান্ড তৈরি করা।

উপসংহার

মোবাইল সেট উৎপাদনে ভারতের এই নতুন চমক প্রমাণ করে যে, সঠিক সরকারি পরিকল্পনা এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন কীভাবে একটি আমদানিকারক দেশকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করতে পারে। আইফোন থেকে শুরু করে সস্তা অ্যান্ড্রয়েড ফোন—সবকিছুর গায়েই এখন শোভা পাচ্ছে 'Made in India' ট্যাগ। দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ হিসেবে ভারতের এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব নিঃসন্দেহে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও প্রযুক্তির মানচিত্রকে বদলে দিচ্ছে।

No comments