রিবেল ক্রিমারির দেউলিয়া ঘোষণা, ২৩.৮ মিলিয়ন ডলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল
আইসক্রিম ব্র্যান্ড রিবেল ক্রিমারির দেউলিয়া ঘোষণা: প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে হারল ২৩.৮ মিলিয়ন ডলারের মামলা
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গ্রোসারি চেইনে জনপ্রিয় আইসক্রিম ব্র্যান্ড রিবেল ক্রিমারি এলএলসি (Rebel Creamery LLC) আর্থিক সংকটে পড়ে চ্যাপ্টার ১১ দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করেছে। ইউটাহ-ভিত্তিক এই কোম্পানিটি ওয়ালমার্ট, ক্রোগার, সেফওয়েসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গ্রোসারি স্টোরে তাদের আইসক্রিম বিক্রি করে। প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ড ভ্যান লিউয়েন আইসক্রিমের (Van Leeuwen Ice Cream) সঙ্গে একটি প্যাকেজিং-সংক্রান্ত মামলায় হেরে যাওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে কোম্পানিটি।
কী ঘটেছিল?
রিবেল ক্রিমারি ১৪ আগস্ট ইউটাহের ফেডারেল বাংকরাপ্টসি কোর্টে চ্যাপ্টার ১১ সুরক্ষার আবেদন করে। আদালতের নথি অনুযায়ী, কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩.৭৮ মিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে দায়ের পরিমাণ প্রায় ২৩.৮৫ মিলিয়ন ডলার। এই দায়ের প্রায় পুরোটাই এসেছে ভ্যান লিউয়েনের বিরুদ্ধে হেরে যাওয়া মামলার রায় থেকে।
মামলাটির মূল বিষয় ছিল "ট্রেড ড্রেস" বা প্যাকেজিং ডিজাইন নকল করার অভিযোগ। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া রিবেল ক্রিমারি তাদের আইসক্রিম পণ্য কম কার্বোহাইড্রেট, বেশি ফ্যাট ও চিনিমুক্ত (কিটো ধরনের) হিসেবে ২০টি ফ্লেভারে গ্রোসারি স্টোরে বিক্রি করত। অন্যদিকে ভ্যান লিউয়েন আরও আগে থেকে বাজারে ছিল — ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি ২০১৪ সালে এবং পরে ২০১৬ সালের আগস্টে তাদের বর্তমান প্যাকেজিং ডিজাইন চালু করে।
আদালতের রায়ে কী বলা হয়েছে?
গত জুলাই মাসে নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের বিচারক এরিক কমিটি (Eric Komitee) এই মামলার রায় দেন। তার রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়, "ভ্যান লিউয়েন রিবেলের সংক্রামিত আইসক্রিম পিন্ট বিক্রি থেকে অর্জিত লাভের ২৩.৭৮৫ মিলিয়ন ডলারের অধিকারী"। বিচারক আরও নির্দেশ দেন আদালতের কেরানিকে বাদীর পক্ষে রায় নথিভুক্ত করে মামলাটি বন্ধ করার জন্য।
শুধু আর্থিক জরিমানাই নয়, বিচারকের মন্তব্য ছিল আরও কঠোর। বিচারক তার রায়ে লেখেন যে বিচার চলাকালীন প্রমাণে কোনো সন্দেহ ছিল না যে রিবেল ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্যান লিউয়েনের ট্রেড ড্রেস লঙ্ঘন ও তা দুর্বল করেছে। এমনকি আদালতের মতে রিবেল তাদের প্যাকেজিং ডিজাইন প্রক্রিয়া নিয়ে মিথ্যা বলেছিল, যদিও রিবেল দাবি করেছিল তারা ২০১৭ সালে কোম্পানি চালুর সময় ভ্যান লিউয়েনের প্যাকেজিং সম্পর্কে অবগত ছিল না।
আদালতের নথি থেকে আরও জানা যায়, রিবেলের প্যাকেজিং প্রথম গ্রোসারি স্টোরে দেখা যায় ২০১৮ সালের আগস্টে, এবং তা ভ্যান লিউয়েনের এক কর্মীর নজরে আসে ২০১৮ সালের শেষদিক বা ২০১৯ সালের শুরুর দিকে।
দেউলিয়া আবেদনের আগে আপিল
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রিবেল ক্রিমারি দেউলিয়া আবেদনের ঠিক আগে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ১২ আগস্ট রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দাখিল করে, আর মাত্র দুই দিন পর ১৪ আগস্ট চ্যাপ্টার ১১ দেউলিয়া আবেদন করে কোম্পানিটি। বাংকরাপ্টসি নথিতে ভ্যান লিউয়েনের ২৩.৭৮৫ মিলিয়ন ডলারের দাবিকে "বিতর্কিত" হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে যে রায়টি আপিলের অধীনে রয়েছে।
তবে আদালতের নথিতে এটাও স্পষ্ট করা হয়নি যে ভ্যান লিউয়েনের রায়ই একমাত্র কারণ ছিল রিবেলের দেউলিয়া হওয়ার পেছনে — অর্থাৎ কোম্পানির আর্থিক সমস্যার অন্য কারণও থাকতে পারে।
চ্যাপ্টার ১১ দেউলিয়া আবেদনের ফলে রিবেলের বিরুদ্ধে সব ধরনের মামলা সাময়িকভাবে স্থগিত (automatic stay) হয়ে যাবে, যতক্ষণ না বাংকরাপ্টসি প্রক্রিয়া আদালতে চলমান থাকে। এর মানে হলো, ভ্যান লিউয়েন চাইলেও এখনই জরিমানার অর্থ আদায় করতে পারবে না।
ভ্যান লিউয়েন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য
২০০৮ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে বেন ও পিট ভ্যান লিউয়েন এবং লরা ও'নিল প্রতিষ্ঠা করেন ভ্যান লিউয়েন আইসক্রিম, যা একটি হলুদ আইসক্রিম ট্রাক দিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং ২০১০ সালে ব্রুকলিনের গ্রিনপয়েন্টে তাদের প্রথম দোকান খোলে। বর্তমানে ২০২৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ১০০টি স্কুপ শপ নিয়ে একটি জাতীয় চেইনে পরিণত হয়েছে কোম্পানিটি। মামলার সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে। ২০২১ সালের এপ্রিলে ভ্যান লিউয়েন রিবেল ক্রিমারির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, যেখানে তারা রিবেলকে প্যাকেজিং পুনর্নকশা করা এবং লঙ্ঘন থেকে অর্জিত লাভের হিসাব দিয়ে তা পরিশোধের নির্দেশনা চেয়েছিল।
আইসক্রিম শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়ছে
এই মামলা আইসক্রিম শিল্পে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার একটি উদাহরণ। বাজার বিশ্লেষণ সংস্থা IBISWorld-এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে (২০২৫ পর্যন্ত) আইসক্রিম স্টোর শিল্পের প্রবৃদ্ধি ৫.৮% বেড়ে ৭.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, আর শুধু ২০২৫ সালেই এই শিল্প ০.৯% বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্র্যান্ড পরিচিতি ও প্যাকেজিং ডিজাইন রক্ষা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, আর এই মামলা তারই একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
এখন কী হবে?
চ্যাপ্টার ১১ দেউলিয়া প্রক্রিয়া রিবেল ক্রিমারিকে তাদের ব্যবসা চালু রেখে ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে। এই সময়ে কোম্পানিটি আদালতের তত্ত্বাবধানে থেকে তাদের আর্থিক পরিস্থিতি পুনর্বিন্যাস করার চেষ্টা করবে। একইসঙ্গে, আপিল আদালতে ভ্যান লিউয়েনের বিরুদ্ধে রায় বহাল থাকবে কিনা তা এখনো অমীমাংসিত।
গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, দেউলিয়া প্রক্রিয়া চলাকালীনও রিবেলের আইসক্রিম সাধারণত দোকানে পাওয়া যেতে থাকবে, কারণ চ্যাপ্টার ১১ সাধারণত ব্যবসা বন্ধ করে দেয় না বরং পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই আইনি লড়াইয়ের ফলাফল কোম্পানির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
উপসংহার
রিবেল ক্রিমারির এই দেউলিয়া ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত, যেখানে দেখা যায় ট্রেডমার্ক ও প্যাকেজিং লঙ্ঘনের মামলা কীভাবে একটি সফল, জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত ব্র্যান্ডকেও আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে। এই মামলার আপিল প্রক্রিয়া এবং দেউলিয়া কার্যক্রমের ফলাফল আগামী দিনগুলোতে স্পষ্ট হবে।

No comments